Conflict Zone - Middle East

ব্যর্থ কূটনীতিঃ যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনা কেন বারবার ভেঙে পড়ে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনাগুলো প্রায় সবসময়ই একটি অসম নীতিগত কাঠামোর মধ্যে হয়। ওয়াশিংটন চায় পরিমাপযোগ্য সীমাবদ্ধতা, কড়াকড়ি যাচাই এবং আঞ্চলিক আচরণে পরিবর্তন। অন্যদিকে তেহরান চায় সম্মান, নিষেধাজ্ঞা-শিথিলতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। যখন দুই পক্ষের এক পক্ষ আলোচনা শুরু করার আগে থেকেই “Pressure” ব্যবহার করে, তখন আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই সমতা হারায়। সাম্প্রতিক রিপোর্টে ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, চাপ ও হুমকির পরিবেশে তারা আলোচনা মানতে রাজি নয়। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভাঙা এবং ইরানি বন্দরে অবরোধ “Genuine Negotiation” এর প্রধান বাধা।

লেখক Hosnain R. Sunny
সময় ২৯/০৪/২৬ ১০:৩৭:৪০
Facebook LinkedIn X (Twitter) WhatsApp Share
সারাংশ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনাগুলো প্রায় সবসময়ই একটি অসম নীতিগত কাঠামোর মধ্যে হয়। ওয়াশিংটন চায় পরিমাপযোগ্য সীমাবদ্ধতা, কড়াকড়ি যাচাই এবং আঞ্চলিক আচরণে পরিবর্তন। অন্যদিকে তেহরান চায় সম্মান, নিষেধাজ্ঞা-শিথিলতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। যখন দুই পক্ষের এক পক্ষ আলোচনা শুরু করার আগে থেকেই “Pressure” ব্যবহার করে, তখন আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই সমতা হারায়। সাম্প্রতিক রিপোর্টে ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, চাপ ও হুমকির পরিবেশে তারা আলোচনা মানতে রাজি নয়। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভাঙা এবং ইরানি বন্দরে অবরোধ “Genuine Negotiation” এর প্রধান বাধা।

একটি অসমাপ্ত দাবার খেলা

বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারমাণবিক দ্বন্দ্ব এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডির নাম। দুটি দেশ। একটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক মহাশক্তি, অন্যটি মধ্যপ্রাচ্যের এক গর্বিত সভ্যতার উত্তরাধিকারী। দশকের পর দশক ধরে একটি টেবিলে বসে, কথা বলে, চুক্তি করে এবং শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তি ভেঙে ফেলে। এই চক্র যেন শেষ হওয়ার নয়। প্রতিটি আলোচনার পেছনে থাকে আশার আলো, আর প্রতিটি ব্যর্থতার পেছনে থাকে পারস্পরিক অবিশ্বাস, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপ এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েন।

প্রশ্ন হলো কেন এই আলোচনাগুলো বারবার ভেঙে পড়ে? উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের দিকে, বুঝতে হবে দুই দেশের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ এবং স্বীকার করতে হবে যে এই সংঘাত কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের প্রশ্ন নয়। এটি আধিপত্য, পরিচয় এবং টিকে থাকার লড়াই।


ইতিহাসের ক্ষত যা শুকায় না

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক কখনোই সহজ ছিল না। ১৯৫৩ সালে সিআইএ-র সহায়তায় ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে উৎখাত করা হয়। এই ঘটনা ইরানিদের মানসে গভীর দাগ ফেলে দেয়। মোসাদ্দেক তেল শিল্পের জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন । আর সেটাই তাঁর পতনের কারণ হয়েছিল। ব্রিটিশ ও আমেরিকান স্বার্থ রক্ষায় শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় রাখা হয়।


এরপর আসে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব। আয়াতুল্লাহ খোমেইনির নেতৃত্বে ইরান এক নতুন পথে হাঁটা শুরু করে। মার্কিন দূতাবাসে ৪৪৪ দিনের জিম্মি সংকট দুই দেশের মধ্যে যে অবিশ্বাসের প্রাচীর তুলে দেয় তা আজও টলানো যায়নি। ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র "শয়তান মহাশক্তি", আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরান একটি "দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র"। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের মাটিতে কূটনীতির বীজ বোনা অত্যন্ত কঠিন।


পারমাণবিক কর্মসূচির উৎস এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির শেকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে আধুনিকীকরণের প্রতীক হিসেবে শাহ Mohammad Reza Pahlavi পশ্চিমা প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেন। ১৯৫০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Dwight D. Eisenhower ঘোষিত “Atoms for Peace” বা “শান্তির জন্য পরমাণু” উদ্যোগের আওতায় ইরানকে পারমাণবিক গবেষণার প্রাথমিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা সহায়তা দেওয়া হয়। ১৯৫৭ সালে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং পরে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণা রিয়্যাক্টর স্থাপনেও মার্কিন সহায়তা দেওয়া হয়। অর্থাৎ, আজ যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্ব সর্বোচ্চ নিরাপত্তা হুমকির ভাষা ব্যবহার করে, সেই কর্মসূচির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি কিন্তু নির্মিত হয়েছিল পশ্চিমা সহায়তার মাধ্যমেই।


শাহের সময় ইরানের পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। তিনি চেয়েছিলেন তেলনির্ভর অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে শিল্পনির্ভর রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে এবং সেই লক্ষ্যে পারমাণবিক শক্তিকে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্র হিসেবে দেখেছিলেন। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও পারমাণবিক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। পশ্চিমা দেশগুলোর বহু কোম্পানি তখন ইরানে পারমাণবিক রিয়্যাক্টর নির্মাণে আগ্রহী ছিল। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামো বদলে দেয়। শাহ পতনের পর আয়াতুল্লাহ নেতৃত্বাধীন নতুন ইসলামি শাসন প্রথমদিকে এই কর্মসূচিকে পশ্চিমা প্রভাবের প্রতীক মনে করে প্রায় স্থগিত করে দেয়। বহু বিদেশি প্রকৌশলী দেশ ছাড়ে, চুক্তি বাতিল হয় এবং ইরানের পারমাণবিক যাত্রা সাময়িকভাবে থেমে যায়।


তবে এই স্থবিরতা স্থায়ী হয়নি। ১৯৮০ এর দশকে Iran–Iraq War ইরানকে একটি কঠিন বাস্তবতা শেখায়। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কেবল আদর্শ দিয়ে টিকে থাকা যায় না। বরং প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা এবং প্রতিরোধক্ষমতা ছাড়া রাষ্ট্র নিরাপদ নয়। যুদ্ধের সময় ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার, পশ্চিমা শক্তির নীরবতা এবং আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা ইরানি নেতৃত্বকে বুঝিয়ে দেয় যে দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত নিরাপত্তা অর্জনের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক শক্তি প্রয়োজন। সেই সময় থেকেই তেহরান নতুন করে পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করে যদিও এবার তা অনেক বেশি গোপনীয় ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ছাতার নিচে পরিচালিত হতে থাকে। রাশিয়া, চীন, পাকিস্তানভিত্তিক কিছু নেটওয়ার্ক এবং নিজস্ব গবেষণা অবকাঠামোর মাধ্যমে ইরান ধীরে ধীরে ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াজাতকরণ, সেন্ট্রিফিউজ প্রযুক্তি এবং ভারী পানির সক্ষমতা তৈরি করতে থাকে।


আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিস্ফোরণ ঘটে ২০০২ সালে। যখন দেখা যায় ইরানের দুটি অঘোষিত স্থাপনার তথ্য বিশ্বমঞ্চে প্রকাশিত হয়ে গেছে। একটি ছিল Natanz Nuclear Facility এ গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং অন্যটি Arak Heavy Water Reactor এ ভারী পানির রিয়্যাক্টর প্রকল্প। এই প্রকাশ আন্তর্জাতিক পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা International Atomic Energy Agency-কে তৎপর করে তোলে। তদন্তে দেখা যায়, ইরান বহু বছর ধরে এমন কিছু পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে যা তার ঘোষিত সুরক্ষা বাধ্যবাধকতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রযুক্তি এমন এক দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা যেখানে একই প্রযুক্তি দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি তৈরি করা যায়, আবার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করলে তা পারমাণবিক অস্ত্রের কাঁচামালও তৈরি করে ফেলা সম্ভব। এখান থেকেই ইরানের কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বব্যাপী সন্দেহ ও অবিশ্বাসের সূচনা।

ইরান শুরু থেকেই যুক্তি দিয়ে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। তেহরানের বক্তব্য। একদিকে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে চিকিৎসা গবেষণা, কৃষি প্রযুক্তি এবং শিল্প উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক জ্ঞান অর্জন করা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বৈধ অধিকার। ইরান আরও বলে, তারা Nuclear Non-Proliferation Treaty এর সদস্য। সুতরাং চুক্তি অনুযায়ী বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনে তাদের বাধা দেওয়ার নৈতিক বা আইনি অধিকার কারও নেই। ইরানি শাসকগোষ্ঠী প্রায়শই এই কর্মসূচিকে “জাতীয় মর্যাদা”, “বৈজ্ঞানিক স্বাধীনতা” এবং “পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ” হিসেবে তুলে ধরে। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পারমাণবিক কর্মসূচি তাই কেবল জ্বালানি প্রকল্প নয়, জাতীয়তাবাদী আবেগেরও একটি প্রতীক।


কিন্তু সমস্যার জায়গা হলো পশ্চিমা দেশগুলো এই ব্যাখ্যায় কখনও পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারেনি। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা মহলের ধারণা ইরান “শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি”র আড়ালে একটি ‘Threshold Capability’ বা এমন অবস্থান তৈরি করছে যেখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলেই অল্প সময়ের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব হবে। কারণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা যত বাড়ে, অস্ত্রমানের উপকরণে পৌঁছাতে সময় তত কম লাগে। গত কয়েক বছরে International Atomic Energy Agency একাধিক প্রতিবেদনে ইরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে এবং উল্লেখ করেছে যে ইরানই একমাত্র অ-পরমাণু অস্ত্রধারী রাষ্ট্র যে এত উচ্চ পর্যায়ের সমৃদ্ধকরণে পৌঁছেছে। এই বাস্তবতা পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে ইরানের ঘোষিত শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।


এখানেই তৈরি হয় মূল মতপার্থক্য। ইরান বলছে এটি সার্বভৌম প্রযুক্তিগত অধিকার, আর পশ্চিম বলছে এটি গোপন অস্ত্রসক্ষমতার প্রস্তুতি। অর্থাৎ বিতর্কটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়। এটি আস্থা, ভূরাজনীতি, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা স্থাপত্যের প্রশ্ন। ইসরায়েলের জন্য একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক ইরান অস্তিত্বগত হুমকি এবং আরেক প্রতিবেশী সৌদি আরব ও উপসাগরীয় রাজতন্ত্রের কাছে এটি আঞ্চলিক ক্ষমতার পালাবদলের ইঙ্গিত। আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি পশ্চিম এশিয়ায় তার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আজ আর শুধু বিজ্ঞান বা জ্বালানি নীতির বিষয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, নিষেধাজ্ঞা, গোপন অভিযান, সামরিক হুমকি এবং বিশ্বশক্তির মুখোমুখি অবস্থানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।


<img src ='https://cms.thepapyrus.com.bd/public/storage/inside-article-image/834qqd2ea.jpg'>

Photo: Natanz Nuclear Facility


JCPOA চুক্তি: আশার সূচনা নাকি সাময়িক বিরতি?

দীর্ঘ এক দশকের নিষেধাজ্ঞা, গোপন সমৃদ্ধকরণ, কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং সামরিক হুমকির পর ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল যখন ইরান এবং বিশ্বের ছয় পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানি মিলিতভাবে স্বাক্ষর করে Joint Comprehensive Plan of Action বা JCPOA। এটি শুধু একটি পারমাণবিক চুক্তি ছিল না। এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য আরেকটি বড় যুদ্ধ ঠেকানোর আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা। পশ্চিমা অবরোধে ক্ষতবিক্ষত ইরানকে কূটনৈতিক কাঠামোর ভেতরে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এবং একইসঙ্গে একটি অবিশ্বাসে ভরা সম্পর্ককে অন্তত নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে নিয়ে আসার রাজনৈতিক পরীক্ষা।


চুক্তির মূল দর্শন ছিল খুব সরল কিন্তু অত্যন্ত কৌশলগত। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির সংবেদনশীল অংশ সীমিত করবে। বিনিময়ে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। এর অধীনে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৩.৬৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে বলা হয় যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্রহণযোগ্য হলেও অস্ত্রমানের অনেক নিচে। দেশটিকে তার প্রায় ৯৮ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ বিদেশে পাঠাতে হয়। হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ খুলে ফেলতে হয় এবং Fordow-এর মতো ভূগর্ভস্থ স্থাপনাকে গবেষণা কেন্দ্রে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। Arak Heavy Water Reactor কে এমনভাবে পুনর্গঠন করার শর্তও দেওয়া হয় যাতে সেখান থেকে অস্ত্রোপযোগী প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এর পাশাপাশি International Atomic Energy Agency কে ইতিহাসের অন্যতম কঠোর পরিদর্শন ও নজরদারির অধিকার দেওয়া হয়। বাস্তবে এর মানে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রথমবারের মতো একটি আন্তর্জাতিক কাঁচের ঘরে বন্দি হয়ে গেল।


এই চুক্তির সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল তথাকথিত “Breakout Time” বৃদ্ধি। অর্থাৎ ইরান যদি হঠাৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে দৌড়ায় তবে একটি বোমার জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম তৈরি করতে তার যে সময় লাগবে, সেটি চুক্তির আগে যেখানে ছিল আনুমানিক দুই থেকে তিন মাস সেখানে তা বেড়ে এক বছরের বেশি হয়। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কাছে এটিই ছিল চুক্তির কেন্দ্রীয় সাফল্য। কারণ এতে বিশ্বশক্তির হাতে কূটনৈতিক বা সামরিক প্রতিক্রিয়ার জন্য সময় পাওয়া যাচ্ছিল। অর্থাৎ JCPOA ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি শেষ করেনি কিন্তু তাৎক্ষণিক ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে ঠেকিয়ে দিয়েছিল।


অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইরানের জন্য এটি ছিল এক বিশাল স্বস্তি। বছরের পর বছর ব্যাংকিং অবরোধ, তেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বিচ্ছিন্নতার কারণে ইরানের অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়েছিল। JCPOA কার্যকর হওয়ার পর কয়েক বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত সম্পদে প্রবেশাধিকার, তেল বিক্রির সুযোগ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং ইউরোপীয় বাণিজ্যের দরজা আংশিক খুলে যায়। তেহরানে তখন একটি নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। সম্ভবত দীর্ঘদিন পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ভেঙে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রবাহে ফিরতে পারবে। প্রেসিডেন্ট Hassan Rouhani এই চুক্তিকে ইরানের “অর্থনৈতিক পুনর্জন্মের সূচনা” হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।


কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে যতটা প্রশংসা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক বাস্তবতায় ততটাই তীব্র বিরোধিতা ছিল। Israel শুরু থেকেই দাবি করে যে এই চুক্তি ইরানকে থামায়নি বরং সময় কিনে দিয়েছে। তেল আবিবের যুক্তি ছিল ইরান তার পারমাণবিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করেনি। কেবল সাময়িকভাবে ধীর করেছে। চুক্তির “Sunset Clauses” বা নির্দিষ্ট সময় পর কিছু বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার ধারা ইসরায়েলের কাছে ছিল সবচেয়ে উদ্বেগজনক। কারণ তাদের ধারণা ছিল যে ১০–১৫ বছর পর ইরান বৈধতার আড়ালে আবারও পূর্ণমাত্রার সমৃদ্ধকরণে ফিরতে পারবে। একইভাবে Saudi Arabia ও উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো মনে করত নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ইরান আরও অর্থনৈতিক শক্তি পাবে। আর সেই অর্থ ব্যবহার করবে তার আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক যেমন Hezbollah, Houthis বা শিয়া মিলিশিয়াদের সহায়তায়।


আরও বড় সমস্যা ছিল আস্থার ঘাটতি। ইরান চুক্তিতে সই করলেও তার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকাঠামো পুরোপুরি পশ্চিমমুখী হয়নি। বিপ্লবী গার্ড, কট্টর আলেমগোষ্ঠী এবং নিরাপত্তা রাষ্ট্রের অংশবিশেষ শুরু থেকেই মনে করত এটি পশ্চিমা অনুপ্রবেশের দরজা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান শিবিরে এবং ওয়াশিংটনের অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের চোখে এটি ছিল অসম্পূর্ণ। কারণ এতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক মিলিশিয়া কার্যক্রম এবং মানবাধিকার প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ফলে JCPOA কার্যত ছিল একটি ‘Technical Nuclear Freeze’ কিন্তু রাজনৈতিক Reconciliation নয়। বাহ্যিকভাবে এটি শান্তির কাঠামো হলেও ভিতরে ভিতরে এটি ছিল সময়সীমাবদ্ধ অবিশ্বাসের বন্দোবস্ত।


সেই কারণেই আজ ফিরে তাকালে দেখা যায় যে JCPOA হয়তো এক ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সাফল্য ছিল। কিন্তু সেটি ছিল না স্থায়ী সমাধান বরং এটি ছিল বিস্ফোরক সংকটের ওপর চাপানো একটি ভারী ঢাকনা। ঢাকনাটি যতক্ষণ ছিল, চাপ নিয়ন্ত্রিত ছিল। কিন্তু নিচের আগুন কখনও নেভেনি। আর সেই অমীমাংসিত আগুনই পরবর্তী অধ্যায়ে নতুন বিস্ফোরণের জন্ম দেয় যখন Donald Trump ক্ষমতায় এসে এই চুক্তিকে “সবচেয়ে খারাপ চুক্তি” আখ্যা দিয়ে আমেরিকাকে সরিয়ে নেন।


Donald Trump: ভেঙে পড়া আস্থা ও ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতি

২০১৫ সালের JCPOA চুক্তি যখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি বিরল সাফল্য হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছিল তখনও এর ভেতরে একটি গভীর রাজনৈতিক দুর্বলতা লুকিয়ে ছিল। চুক্তিটি মূলত Barack Obama প্রশাসনের কূটনৈতিক উদ্যোগের ফল কিন্তু এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্য অর্জন করতে পারেনি। রিপাবলিকান পার্টির বড় অংশ বিশেষত Donald Trump শুরু থেকেই এই সমঝোতাকে একটি “ভুল বার্তা” হিসেবে দেখেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, ওয়াশিংটন এমন একটি রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক মুক্তি দিচ্ছে যে রাষ্ট্র একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থবিরোধী প্রক্সি নেটওয়ার্ক, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা জিইয়ে রেখেছে। Trump নির্বাচনী প্রচারণা থেকেই JCPOA কে “The Worst Deal Ever Negotiated” বলে আক্রমণ করেছিলেন এবং ক্ষমতায় এসে তিনি সেটিকে বাতিল করাকে নিজের কৌশলগত অঙ্গীকারে পরিণত করেন।


২০১৮ সালের মে মাসে Trump প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে JCPOA থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শুধু একটি চুক্তির ভাঙন ছিল না এটি ছিল ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের ন্যূনতম আস্থার কাঠামো ভেঙে পড়ার সূচনা। Washington এর যুক্তি ছিল চুক্তিটি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা স্থায়ীভাবে ধ্বংস করেনি। ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রশ্নে নীরব থেকেছে এবং Tehran এর আঞ্চলিক আগ্রাসন থামাতে পারেনি। Trump দাবি করেন, পুরনো কাঠামো রেখে লাভ নেই বরং এমন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে হবে যাতে ইরান আরও কঠোর, আরও বিস্তৃত এবং আমেরিকার শর্তাধীন একটি নতুন চুক্তিতে আসতে বাধ্য হয়।


এই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় তথাকথিত “Maximum Pressure Campaign”। যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে ইরানের ওপর প্রায় সব প্রধান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং লেনদেন, ডলার অ্যাক্সেস, আন্তর্জাতিক শিপিং, ধাতু শিল্প, এমনকি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে ইরানের ব্যবসায়িক সম্পর্ক পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু হয়। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট যে ইরানের অর্থনীতিকে এমনভাবে শ্বাসরুদ্ধ করা যাতে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব কমে যায়, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাড়ে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র কৌশলগত ছাড় দিতে বাধ্য হয়। বাস্তবে এর প্রভাব ছিল ভয়াবহ। ইরানি রিয়ালের দরপতন ঘটে, মুদ্রাস্ফীতি উর্ধ্বমুখী হয়, বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় শূন্যে নেমে আসে, তেল বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে যায় এবং সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়।


কিন্তু অর্থনৈতিক চাপের চেয়েও বড় আঘাত ছিল রাজনৈতিক। Tehran এর দৃষ্টিতে এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা। পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে লিখিত সমঝোতাও আমেরিকার ক্ষমতার পালাবদলে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ ইরান যে ছাড় দিয়েছিল সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ কমানো, সেন্ট্রিফিউজ ভাঙা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ মেনে নেওয়া; তার বিনিময়ে যে নিষেধাজ্ঞামুক্তির প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল, তা একতরফাভাবে তুলে নেওয়া হলো। ফলে ইরানের অভ্যন্তরে মধ্যপন্থী ও কূটনৈতিক গোষ্ঠী মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। যারা বলেছিল পশ্চিমের সঙ্গে আলোচনায় লাভ আছে, তারা রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে যায়। আর কট্টরপন্থীরা বলতে শুরু করে “আমরা আগেই বলেছিলাম, আমেরিকাকে বিশ্বাস করা যায় না।” এই মানসিক ভাঙন পরবর্তী সব আলোচনার ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়।


Trump প্রশাসন শুধু অর্থনৈতিক অবরোধেই থামেনি। তারা সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপও বাড়াতে থাকে। Persian Gulf এ মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি জোরদার করা হয়। ইরানের Revolutionary Guard Corps কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং Tehran-এর আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলায় Israel ও Gulf allies দের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় শুরু হয়। উত্তেজনার শীর্ষে পৌঁছায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, যখন Baghdad এ মার্কিন ড্রোন হামলায় Qasem Soleimani নিহত হন। তিনি শুধু একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রক্সি কৌশলের প্রধান স্থপতি। তার হত্যাকাণ্ড Tehran এর কাছে ছিল সরাসরি রাষ্ট্রীয় অপমান এবং যুদ্ধসদৃশ বার্তা।


এই সময় ইরানও বুঝে যায় যে শুধু চুক্তি মেনে নিষ্ক্রিয় থাকলে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা ফিরছে না। ফলে Tehran ধীরে ধীরে JCPOA এর সীমাবদ্ধতাগুলো অমান্য করা শুরু করে। প্রথমে নির্ধারিত সীমার বেশি নিম্নমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ, তারপর ৩.৬৭ শতাংশ সীমা ভেঙে উচ্চতর সমৃদ্ধকরণ, পরে আরও উন্নত সেন্ট্রিফিউজ স্থাপন সবকিছু ধাপে ধাপে এগোয়। ইরান একধরনের “Calibrated Escalation” নীতি নেয়। পুরোপুরি চুক্তি ছিন্ন না করে কিন্তু পর্যায়ক্রমে দেখিয়ে দেয় যে আমেরিকার চাপের জবাব প্রযুক্তিগত গতিবৃদ্ধি দিয়েই দেওয়া হবে। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তৈরি হয় যে Trump ইরানকে নতুন চুক্তিতে আনতে চেয়েছিলেন কিন্তু উল্টো ইরানকে আগের চেয়ে বেশি পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে ঠেলে দেন।


ইউরোপীয় দেশগুলো বিশেষত France, Germany ও United Kingdom চুক্তি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল। তারা INSTEX এর মতো বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে সীমিত বাণিজ্য চালু রাখতে চেয়েছিল কিন্তু আমেরিকার Secondary Sanctions এর ভয়ে বড় কোম্পানিগুলো পিছিয়ে যায়। ফলে ইউরোপের প্রতিশ্রুতি কাগজে থাকলেও বাস্তব অর্থনৈতিক স্বস্তি ইরান পায়নি। Tehran এর চোখে তখন পশ্চিমা প্রতিশ্রুতি মানে দাঁড়ায় “কথা আছে, কার্যকারিতা নেই।”


এই পর্যায়ে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংকট একটি নতুন মাত্রা পায়। JCPOA যে অন্তত পারমাণবিক ফাইলকে নিয়ন্ত্রিত রেখেছিল Trump-এর প্রত্যাহারের পর সেই নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিই ভেঙে যায়। অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ, সামরিক হুমকি, কূটনৈতিক বিশ্বাসহীনতা এবং প্রতিশোধমূলক সমৃদ্ধকরণ সব মিলিয়ে সম্পর্কটি আর Negotiation Framework এ সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি রূপ নেয় Coercion versus Resistance এর লড়াইয়ে। অর্থাৎ একদিকে Washington এর চাপ অন্যদিকে Tehran এর প্রতিরোধ। আর এই সংঘর্ষই পরবর্তী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পরমাণু পর্যবেক্ষকদের সামনে নতুন এক ভয়াবহ প্রশ্ন তোলে। আর তা হলো ইরান কি এখন কেবল চুক্তি লঙ্ঘন করছে? নাকি বাস্তবিকই পারমাণবিক বোমার দিকে দৌড়াচ্ছে?


<img src ='https://cms.thepapyrus.com.bd/public/storage/inside-article-image/xd1yd6wjg.jpg'>

Photot: JCPOA Pact


ইরানের পাল্টা সমৃদ্ধকরণ, IAEA সতর্কতা এবং বিশ্বশক্তির আতঙ্ক

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতির প্রথম ধাক্কা সামলানোর পর ইরান খুব দ্রুত বুঝে যায় যে শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদ বা নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়ে Washington কে পিছু হটানো সম্ভব নয়। JCPOA তে থেকে একতরফাভাবে সব শর্ত মানলে অর্থনীতি মুক্ত হবে না আবার সরাসরি চুক্তি ছিঁড়ে ফেললে আন্তর্জাতিক দায় পুরোপুরি Tehran এর ঘাড়ে এসে পড়বে। ফলে ইরান এমন একটি কৌশল নেয় যাকে অনেক বিশ্লেষক বলেন “Nuclear Leverage Building” অর্থাৎ ধীরে ধীরে পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়িয়ে এমন এক চাপ তৈরি করা যাতে বিশ্বশক্তি বাধ্য হয় ইরানকে আবার আলোচনার কেন্দ্রে নিতে। এটি ছিল না তাৎক্ষণিক বোমা তৈরির ঘোষণা; বরং ছিল প্রযুক্তিগতভাবে সেই দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়ে রাজনৈতিক দরকষাকষির শক্তি বাড়ানো।


এই নীতির অধীনে Tehran ২০১৯ সাল থেকেই ধাপে ধাপে JCPOA এর সীমাবদ্ধতা ভাঙতে শুরু করে। প্রথমে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ চুক্তির নির্ধারিত ৩০০ কেজির সীমা ছাড়িয়ে যায়। পরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৩.৬৭ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ, তারপর ২০ শতাংশ এবং শেষ পর্যন্ত ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত করা হয়। পারমাণবিক কৌশল বিশ্লেষকদের কাছে এই সংখ্যাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ ৬০ শতাংশে পৌঁছানো মানে প্রযুক্তিগতভাবে অস্ত্রমানের ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামে পৌঁছানোর পথ অনেকটাই ছোট হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ সম্পূর্ণ বোমা তৈরি না করেও ইরান দেখিয়ে দেয় প্রয়োজনে দ্রুত এগোনোর সক্ষমতা সে অর্জন করছে। একইসঙ্গে Natanz ও Fordow এ নতুন প্রজন্মের IR-6 এবং IR-9 সেন্ট্রিফিউজ স্থাপন ইঙ্গিত দেয় যে Tehran আর কেবল পুরনো সক্ষমতা ফিরিয়ে আনছে না; বরং আগের চেয়ে আরও উন্নত, দ্রুত এবং গভীর সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো গড়ে তুলছে।


এখানে একটি মৌলিক কৌশলগত পরিবর্তন লক্ষণীয়। JCPOA পূর্ব সময়ের ইরান ছিল গোপন কর্মসূচি লুকিয়ে রাখা রাষ্ট্র। কিন্তু JCPOA পরবর্তী ভাঙনের পর ইরান অনেকাংশে প্রকাশ্য “Calculated Opacity” নীতি নেয় অর্থাৎ সম্পূর্ণ তথ্য দেয় না, কিন্তু এতটুকু জানায় যাতে বিশ্ব বুঝতে পারে সক্ষমতা বাড়ছে। Tehran মূলত বার্তা দেয়: “তোমরা যদি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা না দাও, তবে আমরা প্রযুক্তিগত বাস্তবতা বদলে দেব।” এই বাস্তবতা কেবল আমেরিকার জন্য নয়। ইউরোপ, রাশিয়া, চীন এমনকি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। কারণ পারমাণবিক ফুয়েল যত এগোয়, যুদ্ধের সম্ভাবনা তত বাড়ে; আবার ইরানকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলাও সম্ভব হয় না।


International Atomic Energy Agency এই পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে সতর্কবার্তা দিতে শুরু করে। সংস্থার পরিদর্শকরা একাধিক রিপোর্টে উল্লেখ করেন যে ইরানের ঘোষণাবহির্ভূত কিছু স্থানে অতীত পারমাণবিক উপাদানের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং Tehran সব প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিচ্ছে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, IAEA জানায় যে তাদের পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা আগের তুলনায় সীমিত হয়ে যাচ্ছে, কারণ ইরান অনেক ক্যামেরা ও মনিটরিং ব্যবস্থার অ্যাক্সেস কমিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আর নিশ্চিতভাবে জানতেই পারছে না ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোর প্রতিটি স্তরে কী ঘটছে। এই ‘Visibility Gap’ বিশ্বশক্তির আতঙ্ককে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কারণ পারমাণবিক সংকটে তথ্যের অনিশ্চয়তা নিজেই একটি নিরাপত্তা বিপদ। আপনি জানেন না প্রতিপক্ষ ঠিক কত দূর এগিয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আলোচনায় তখন একটি শব্দ ক্রমশ সামনে আসে “Breakout Threshold”। এর মানে হলো, এমন একটি অবস্থান যেখানে ইরান রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলে খুব অল্প সময়ে অস্ত্রমানের পর্যাপ্ত fissile material তৈরি করতে পারবে। বহু থিংকট্যাংক ও নন-প্রলিফারেশন বিশেষজ্ঞের হিসাব অনুযায়ী, JCPOA-র সময় যেখানে Breakout Time ছিল এক বছরের বেশি, তা কমে কয়েক সপ্তাহ বা এক-দুই মাসের ঘরে নেমে আসে। এই পরিবর্তন সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ এত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে কূটনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা, বা গোয়েন্দা সতর্কতা কার্যকর করা অনেক কঠিন হয়ে যায়। ফলে প্রশ্নটি আর থাকে না “ইরান বোমা বানাচ্ছে কি না”; প্রশ্ন দাঁড়ায় “ইরান চাইলে কত দ্রুত বোমার উপাদান প্রস্তুত করতে পারবে?”


এখানেই বিশ্বশক্তির আতঙ্কের দ্বিতীয় স্তর শুরু হয় Regional Domino Effect। যদি ইরান বাস্তবিক অর্থে Threshold Nuclear State এ পরিণত হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রও নিশ্চুপ থাকবে না। Saudi Arabia বহুবার ইঙ্গিত দিয়েছে যে Tehran পারমাণবিক অস্ত্রসক্ষম হলে Riyadh ও নিজস্ব প্রতিরোধ বিকল্প খুঁজবে। Turkey এবং Egypt এর নিরাপত্তা মহলেও একই ধরনের আলোচনা বহুদিন ধরে রয়েছে। অর্থাৎ ইরানের অগ্রগতি একটি একক রাষ্ট্রের পারমাণবিক সমস্যা নয়; এটি গোটা মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য পারমাণবিক প্রতিযোগিতার সূচনা করতে পারে। আর মধ্যপ্রাচ্য যদি বহুমুখী পারমাণবিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অঞ্চলে পরিণত হয় তাহলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা স্থাপত্যে তার অভিঘাত হবে কয়েক দশকব্যাপী।


আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো ইরান কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়নি যে তারা বোমা বানাচ্ছে। বরং Tehran বারবার বলেছে তারা কেবল চাপে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে এবং তাদের সব পদক্ষেপ reversible, যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে perception বা উপলব্ধি প্রায়শই ঘোষণার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। Israel, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা নিরাপত্তা জোটের কাছে ইরানের এই “Reversible Escalation” মোটেও নিরীহ মনে হয়নি; বরং এটি মনে হয়েছে Deliberate Nuclear Brinkmanship অর্থাৎ যুদ্ধের কিনারায় গিয়ে প্রতিপক্ষকে ছাড় দিতে বাধ্য করার খেলা।


ফলে ২০২১ থেকে ২০২৬-এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক ফাইল একটি নতুন সংজ্ঞা পায়। এটি আর শুধুমাত্র একটি Non-Proliferation issue নয়, এটি Coercive Diplomacy এর অস্ত্রে পরিণত হয়। Tehran প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে রাজনৈতিক দরকষাকষির শক্তি হিসেবে; আর পশ্চিম সেটিকে দেখছে সময় ফুরিয়ে আসা অস্ত্রঝুঁকি হিসেবে। এই দ্বৈত ব্যাখ্যার সংঘর্ষ থেকেই পরবর্তী অধ্যায়ে আরও বিপজ্জনক বাস্তবতা জন্ম নেয়। কারণ যখন কূটনৈতিক আস্থা কমে যায় এবং প্রযুক্তিগত দূরত্ব কমে আসে, তখন গোপন হামলা, সাইবার আক্রমণ ও ছায়াযুদ্ধ দ্রুত সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের দিকে মোড় নেয়।


<img src ='https://cms.thepapyrus.com.bd/public/storage/inside-article-image/nopy987lp.jpg'>


ইসরায়েল ফ্যাক্টর: নীরব কিন্তু নির্ধারক

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা যতবারই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে হয়েছে বাস্তবে প্রতিবারই একটি রাষ্ট্র ছায়া থেকে পুরো সমীকরণকে প্রভাবিত করেছে। আর সেটি হলো Israel। আনুষ্ঠানিক আলোচনায় ইসরায়েল কখনও JCPOA এর স্বাক্ষরকারী ছিল না। IAEA পরিদর্শন কাঠামোর অংশও নয় কিন্তু ইরান প্রশ্নে ওয়াশিংটনের প্রায় প্রতিটি কৌশলগত সিদ্ধান্তে তেল আবিবের নিরাপত্তা উদ্বেগ একটি নীরব কিন্তু নির্ধারক চাপ হিসেবে কাজ করেছে। কারণ ইসরায়েলের কাছে এটি কোনো সাধারণ কূটনৈতিক ফাইল নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন। তেল আবিবের নিরাপত্তা মতবাদ অত্যন্ত পরিষ্কার। মধ্যপ্রাচ্যে এমন কোনো শত্রুর হাতে পারমাণবিক সক্ষমতা যেতে দেওয়া যাবে না যে রাষ্ট্র প্রকাশ্যে ইসরায়েলবিরোধী মতাদর্শ ধারণ করে।


এই কারণেই ইসরায়েল বহু বছর ধরে একই বার্তা দিয়ে আসছে “ইরানকে আলোচনায় ব্যস্ত রাখা যায় কিন্তু ইরানকে পারমাণবিক threshold এ পৌঁছাতে দেওয়া যায় না।” অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যখন কূটনৈতিক চুক্তি, নিষেধাজ্ঞা ও আলোচনা দিয়ে Tehran-কে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে, তখন ইসরায়েল সমান্তরালভাবে আরেকটি কৌশল চালিয়েছে। Delay, Disrupt, Degrade. তাদের লক্ষ্য ছিল সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই ইরানের পারমাণবিক অগ্রগতিকে বছরের পর বছর পিছিয়ে দেওয়া। এই নীতির কেন্দ্রে ছিল Mossad-এর বহুমাত্রিক গোপন অভিযান।

সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ নিঃসন্দেহে Natanz uranium enrichment facility তে সাইবার ধ্বংসাত্মক হামলা। Stuxnet নামে পরিচিত সেই ম্যালওয়্যারকে আধুনিক রাষ্ট্রীয় সাইবার যুদ্ধের প্রথম সফল শিল্প-সাবোটাজ অস্ত্র হিসেবে ধরা হয়। এই ডিজিটাল অস্ত্র ইরানের সেন্ট্রিফিউজগুলোকে বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখিয়ে ভেতরে অস্বাভাবিক গতিতে ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে অকেজো করে দেয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে আসে যে এটি ছিল মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ গোয়েন্দা প্রকল্প এবং এর ফলে নাতাঞ্জে শত শত; এমনকি প্রায় এক হাজার পর্যন্ত সেন্ট্রিফিউজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। Stuxnet এর তাৎপর্য শুধু প্রযুক্তিগত ক্ষতি নয়। এটি Tehran কে বুঝিয়ে দেয় যে তার সবচেয়ে সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক অবকাঠামোও অদৃশ্য আঘাতের বাইরে নয়।


কিন্তু সাইবার হামলাই ছিল না একমাত্র পদ্ধতি। গত দেড় দশকে ইরানের একাধিক শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানী রহস্যজনক বোমা হামলা, মোটরসাইকেল শুটিং বা দূরনিয়ন্ত্রিত অপারেশনে নিহত হন। পশ্চিমা ও আঞ্চলিক গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের বড় অংশই এই হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে Mossad এর সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেছে। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট। শুধু যন্ত্রপাতি ধ্বংস নয়, জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্বও ক্ষয় করা। কারণ পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল স্থাপনা দিয়ে চলে না; এটি চালায় বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, গবেষণা নকশা এবং মানব নেটওয়ার্ক। একজন বিজ্ঞানী নিহত মানে কখনও কখনও একটি গবেষণা ধাপ বছরের জন্য পিছিয়ে যাওয়া।


এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থাপনার ভেতরে বিস্ফোরণ, বৈদ্যুতিক বিভ্রাট, সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ অনুপ্রবেশ এবং গোপন নাশকতা। ২০২০ ও ২০২১ সালে Natanz-এ যে ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ও বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে, তার পেছনেও ইসরায়েলি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলেন এগুলো Stuxnet-পরবর্তী নতুন প্রজন্মের গভীর Sabotage Architecture এর অংশ। কিছু রিপোর্টে এমনও উঠে আসে যে ইরানের ভেতরেই বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের ব্যবহার করে Mossad বহুস্তরীয় অন্তর্ঘাত পরিচালনা করেছিল। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্র সীমান্তে নয়। যুদ্ধক্ষেত্র ঢুকে গেছে ইরানের ল্যাবরেটরি, সার্ভার, বিদ্যুৎ লাইন এবং গবেষণা নেটওয়ার্কে।


কেন ইসরায়েল এতটা আক্রমণাত্মক? এর উত্তর কেবল কৌশলগত নয়, মানসিকও। ইরানের বহু শীর্ষ নেতা অতীতে এমন ভাষণ দিয়েছেন যেখানে ইসরায়েলি রাষ্ট্রকে অবৈধ সত্তা বা বিলুপ্ত হওয়া উচিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও এসব বক্তব্যের রাজনৈতিক অনুবাদ নিয়ে বিতর্ক আছে তবু ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতিনির্ধারকদের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত সরল যে রাষ্ট্র তাদের বৈধতা অস্বীকার করে, সেই রাষ্ট্রের হাতে পারমাণবিক অস্ত্রসক্ষমতা যাওয়া মানে অনির্দেশ্য ঝুঁকি। Holocaust পরবর্তী ইসরায়েলি নিরাপত্তা মনস্তত্ত্বে “Never Again” শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি Preemptive Doctrine এর ভিত্তি। অর্থাৎ শত্রু যদি ভবিষ্যতে অস্তিত্বগত হুমকি হতে পারে তাকে আগে থেকেই থামাতে হবে।


ফলে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো “নরম” বা “অসম্পূর্ণ” চুক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের অভিযোগ ওয়াশিংটন প্রায়ই সময় কিনতে চায় কিন্তু ইসরায়েল সময় হারানোর সামর্থ্য রাখে না। এই কারণেই প্রতিটি মার্কিন প্রশাসনের ওপর তেল আবিব প্রবল লবিং চাপ সৃষ্টি করেছে যাতে Iran deal কখনও Tehran কে পূর্ণ প্রযুক্তিগত Breathing Space না দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ইসরায়েল প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে প্রয়োজনে একতরফা সামরিক বিকল্প বিবেচনা থেকে তারা সরে আসেনি।


অর্থাৎ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার দৃশ্যমান টেবিলে দু’পক্ষ থাকলেও অদৃশ্য টেবিলে তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে ইসরায়েল সবসময় উপস্থিত। Washington যেখানে কূটনৈতিক সময়সীমা নিয়ে চিন্তা করে, তেল আবিব চিন্তা করে Survival Timeline নিয়ে। আর এই দুই timeline এর সংঘর্ষই ইরান পারমাণবিক প্রশ্নকে কখনও স্থিতিশীল হতে দেয়নি। ফলে বোঝা যায় ইসরায়েল শুধু একটি উদ্বিগ্ন পর্যবেক্ষক নয়; এটি পুরো পারমাণবিক সমীকরণের নীরব Veto Power।


রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা

JCPOA আলোচনায় রাশিয়া ও চীন ছিল এবং তারা ইরানের পক্ষে নরম অবস্থান নিয়েছিল। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া-পশ্চিম সম্পর্কের অবনতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনা বৃদ্ধি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রাশিয়া ও চীন এখন ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছে বাণিজ্য, অস্ত্র এবং কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে। এই পরিস্থিতিতে ইরান মনে করছে যে পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞার বিকল্প সে রাশিয়া ও চীনের মাধ্যমে পেতে পারে। এই মনোভাব ইরানকে আলোচনায় আরও কঠিন অবস্থান নিতে সাহস দেয়।


ভবিষ্যতের পথ কোথায়?

এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে কী করতে হবে? কূটনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা কিছু পথের কথা বলছেন:

প্রথমত, চুক্তিকে দলীয় রাজনীতির বাইরে নিয়ে যাওয়া দরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পারমাণবিক চুক্তিকে যদি সিনেটে অনুমোদন করা হয় (যেমনটা সাধারণ আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে হয়) তাহলে পরবর্তী প্রশাসন একতরফাভাবে বের হতে পারবে না।


দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক প্রশ্নকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বৃহত্তর আলোচনা থেকে আলাদা করা দরকার। ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নগুলো আলাদাভাবে আলোচনা করা যেতে পারে।


তৃতীয়ত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যে একটি পারস্পরিক নিরাপত্তা সংলাপ যেখানে ইরান, সৌদি আরব, ইসরায়েল সবাই অংশগ্রহণ করবে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার পথ খুলতে পারে।


চতুর্থত, ইরানি জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। ইরানের তরুণ প্রজন্ম পশ্চিমের সাথে সহযোগিতায় আগ্রহী। নিষেধাজ্ঞার চাপ সরকারকে নয়, সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেয়। সংযুক্তির নীতি দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকর হতে পারে।


লেখক
Hosnain R. Sunny Graduated from The London School of Economics and Social Sciences (LSE) in Politics and Economics and a Professional Accountant with more than Twelve (12) Years of Industry Experience including Ernst and Young, Grant Thornton etc. He is the Managing Editor of Country's first Philosophical and Political Economy Magazine ''The Papyrus''. Dhaka, Bangladesh

Comments