বাংলাদেশ আজ এমন এক রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার মুখে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে যুদ্ধ হচ্ছে হাজার মাইল দূরে ইরানের আকাশে কিন্তু তার আগুনে পুড়ছে বাংলার রান্নাঘর, কৃষকের সেচপাম্প, গ্রামের বিদ্যুৎ লাইন, শহরের পরিবহন, শিল্পকারখানার বয়লার এবং সাধারণ মানুষের শেষ সঞ্চয়। ফেব্রুয়ারিতে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে ক্ষমতায় আসা তারেক রহমান সরকারের তিন মাস পূর্ণ হতে না হতেই দেশের মানুষ বুঝে গেছে শাসক বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না, মুখ বদলালেই নীতির দক্ষতা জন্মায় না, আর বক্তৃতা দিয়ে জ্বালানি আসে না। যে সরকার জনগণকে স্থিতিশীলতা, বাজার নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই সরকার আজ আন্তর্জাতিক দাতাদের দরজায় দুই বিলিয়ন ডলারের ভিক্ষার থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধুমাত্র দেশের তেল-গ্যাস আমদানি সচল রাখার জন্য। সরকার নিজেই স্বীকার করেছে যে জ্বালানি সংকট সামাল দিতে জরুরি বহিঃসহায়তা প্রয়োজন কারণ রাষ্ট্রীয় কোষাগার এই ধাক্কা বহন করার মতো অবস্থায় নেই।
প্রশ্ন হলো, কেন নেই? কোথায় গেল সেই প্রস্তুতি? সেই কৌশল, সেই মহাপরিকল্পনা, যার গল্প শুনিয়ে নির্বাচনী মঞ্চ কাঁপানো হয়েছিল? বাংলাদেশ তো রাতারাতি জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হয়নি। দেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি নির্ভর এ তথ্য নতুন নয়। ইরান যুদ্ধের সম্ভাবনা ফেব্রুয়ারির আগেই আন্তর্জাতিক বাজারে আলোচিত ছিল। হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্ন ঘটলে কী হবে, LNG কার্গো ব্যাহত হলে কী হবে, স্পট মার্কেটের দাম বাড়লে কী হবে এসব কোনো অজানা সমীকরণ ছিল না। অথচ সরকার ক্ষমতায় এসেই কেবল বক্তৃতা করেছে, প্রশাসনিক বৈঠক করেছে, কিন্তু মাঠে কোনো জরুরি জ্বালানি কমান্ড সিস্টেম দাঁড় করাতে পারেনি। ফলাফল, এপ্রিল মাসে নির্ধারিত LNG আমদানির বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থেকে না এসে স্পট মার্কেটের আগুনদামে কিনতে হয়েছে। যার ফলে মাত্র মার্চ-এপ্রিল দুই মাসেই অতিরিক্ত প্রায় ৪৫ বিলিয়ন টাকার ভর্তুকির বোঝা রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপেছে।
এই ৪৫ বিলিয়ন টাকা কোথা থেকে আসবে? জনগণের পকেট থেকে অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের ছাপাখানা থেকে। রাষ্ট্র যখন উৎপাদন বাড়াতে পারে না, রপ্তানি বাড়াতে পারে না, রিজার্ভে ডলার তুলতে পারে না, তখন তার শেষ ভরসা হয় ঋণ আর মুদ্রা সম্প্রসারণ। আজ সেই পথেই হাঁটছে সরকার। বাইরে ঋণ চাইছে, ভেতরে তারল্য বাড়াচ্ছে, আর জনগণকে বলছে “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।” এটি নিয়ন্ত্রণ নয়, এটি সময় কিনে নেওয়া। এটি চিকিৎসা নয়, এটি স্যালাইন ঝুলিয়ে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। কিন্তু অর্থনীতির আইসিইউতে থাকা রাষ্ট্রকে স্যালাইন দিয়ে বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। সামনে যে মূল্যস্ফীতির দ্বিতীয় ঢেউ আসছে, তার শব্দ ইতোমধ্যেই বাজারে শোনা যাচ্ছে।
তারেক রহমান সরকার আজ যে সবচেয়ে বড় অপরাধটি করেছে তা হলো সংকটকে যুদ্ধের ঘাড়ে চাপিয়ে নিজের প্রশাসনিক অযোগ্যতাকে আড়াল করার চেষ্টা। যুদ্ধ অবশ্যই একটি কারণ কিন্তু যুদ্ধ সংকটের জন্ম দেয়নি। যুদ্ধ কেবল সরকারের দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। দেশে ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে বলে বছরের পর বছর প্রচার হয়েছে অথচ আজ গ্রামে দিনে ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিং কেন? কারণ সেই সক্ষমতার বড় অংশ কাগুজে; তেল নেই, গ্যাস নেই, LNG নেই, কয়লার সরবরাহ সমন্বয় নেই। জেনারেটর আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই। প্ল্যান্ট আছে, কিন্তু ফিড নেই। অর্থাৎ সরকার জনগণকে অবকাঠামোর ছবি দেখিয়েছে, কার্যকারিতার নিশ্চয়তা দেয়নি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রাশিয়া জ্বালানি লোডিং শুরু করলেও সেটি এখনো জাতীয় চাহিদা সামাল দেওয়ার অবস্থায় পৌঁছায়নি। সীমিত বিদ্যুৎ আসতে সময় লাগবে। অথচ এই বাস্তবতা জেনেও সরকার বিকল্প জ্বালানি রিজার্ভ, দ্রুত আমদানি করিডর, Decentralized Rural Power Protection কোনোটিই নিশ্চিত করেনি।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, FSRU, LNG Storage, Fuel Rail Logistics এত এত প্রকল্পের নাম আছে কিন্তু সংকটকালে সেগুলো কোথায়? জনগণ দেখছে হাজার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে; কিন্তু তেল নিতে পারছে না, গ্যাস আনতে পারছে না, গ্রিড বাঁচাতে পারছে না। এর চেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় প্রতারণা আর কী হতে পারে? উন্নয়নের বিলবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে কিন্তু সংকটের দিনে সেই উন্নয়ন জনগণের ঘরে এক ফোঁটা আলোও দিতে পারছে না। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি নীতিগত প্রতারণা।
সবচেয়ে ভয়ংকর চিত্র তৈরি হয়েছে জ্বালানির খুচরা বাজারে। LPG সিলিন্ডার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। LNG ঘাটতিতে শিল্পে রেশনিং, ডিজেল ও অকটেনের জন্য পাম্পে মাইলের পর মাইল লাইন, কোথাও কোথাও পাম্প বন্ধ, কোথাও সীমিত সরবরাহ। সরকার বলছে পর্যাপ্ত মজুত আছে কিন্তু জনগণ লাইনে দাঁড়িয়ে বুঝে গেছে সরকারি ব্রিফিং আর বাস্তব বাজার এক জিনিস নয়। সামাজিক মাধ্যমে এবং মাঠপর্যায়ের মানুষের অভিজ্ঞতায় একই অভিযোগ। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মজুতদার ও ডিলার সিন্ডিকেট কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে, আর সরকার কেবল প্রেস ব্রিফিং করছে। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ যখন নীতিতে থাকে না তখন নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সিন্ডিকেটের হাতে; আজ বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে সেটাই ঘটেছে।
হবিগঞ্জের মনতলায় তেলবাহী ট্রেন দুর্ঘটনার পর শত শত মানুষ জেরিক্যান, বালতি, ড্রাম নিয়ে ছুটে গিয়ে ছড়িয়ে পড়া ডিজেল কুড়িয়ে নিয়েছে। এই দৃশ্যকে কেউ বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবলে ভুল করবে। এটি ক্ষুধার ছবি নয়, এটি জ্বালানি আতঙ্কের ছবি। জনগণ জানে বাজারে তেল অনিশ্চিত। তাই মাটিতে পড়া তেলও সম্পদ। একটি রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কতটা ভেঙে গেলে নাগরিক এমন ঝুঁকি নেয় সেই প্রশ্ন সরকারকে করতে হবে।
এই সরকারের আরেকটি ব্যর্থতা হলো যোগাযোগে মিথ্যাচার। একদিকে মন্ত্রীরা বলছেন জ্বালানি সংকট নেই সব স্বাভাবিক; অন্যদিকে একই সরকার অফিস সময় কমাচ্ছে, বাজার সন্ধ্যার আগেই বন্ধ করছে, বিদ্যুৎ সাশ্রয় আদেশ দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক তহবিল চাইছে, স্পট LNG আগুনদামে কিনছে। জনগণ কি এতটাই বোকা যে এই দ্বিচারিতা বুঝবে না? সরকার যদি সত্যিই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখত, তাহলে কেন সার কারখানা বন্ধ করে গ্যাস বাঁচাতে হতো? কেন চারটি বড় সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে? এর মানে সরকার শিল্প বন্ধ করে নাগরিক বিদ্যুৎ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। আজ সার কারখানা বন্ধ, কাল কৃষিতে প্রভাব, পরশু খাদ্যদ্রব্যে মূল্যবৃদ্ধি। এই চেইন রিঅ্যাকশন সরকার কি বোঝে না, নাকি বোঝেও জনগণকে বলছে না?
তারেক রহমান সরকারের তিন মাসের সারাংশ যদি এক বাক্যে বলতে হয়, তবে তা হলো প্রস্তুতির বদলে প্রতিক্রিয়া, নীতির বদলে ঘোষণাপত্র, ব্যবস্থাপনার বদলে মাইক্রোফোন। সরকার সংকটের আগে কাজ করেনি; সংকটের পরে ভাষণ দিয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা দেয়নি; বরং দাতাদের কাছে হাত পেতেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণ করেনি; সিন্ডিকেটকে সময় দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করেনি বরং সম্ভাব্য মুদ্রা সম্প্রসারণের রাস্তা খুলে দিয়েছে। জনগণকে সত্য বলেনি; বরং আশ্বাসের প্যাকেট দিয়েছে। আর এই সবকিছুর মাশুল দিচ্ছে গ্রামবাংলার মানুষ যে রাতে ফ্যান ছাড়াই ঘুমায়; শহরতলির ড্রাইভার যে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পায় না। কৃষক; যে সেচের ডিজেল নিয়ে অনিশ্চয়তায় এবং নিম্নবিত্ত পরিবার যার LPG সিলিন্ডার এখন বিলাসপণ্য।
ক্ষমতায় আসার আগে এই সরকার বলেছিল তারা “রাষ্ট্র চালাতে জানে।” এখন প্রশ্ন এটাই কি সেই জানা? যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় অদক্ষতা চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু অন্ধকারে বসে থাকা মানুষের ঘরে অজুহাত জ্বলে না। চুলায় আগুন না জ্বললে মানুষ ভূরাজনীতি বোঝে না; মানুষ কেবল সরকারকে দায়ী করে। আর সেই দায় এখন দ্রুত জমা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির জনআশা মে মাসে এসে ক্রোধে পরিণত হচ্ছে। কারণ মানুষ দেখতে পাচ্ছে সরকার আছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নেই; অবকাঠামো আছে, কিন্তু ব্যবহার নেই; ভাষণ আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ নেই; প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু তেল নেই। এই ব্যর্থতা যদি অবিলম্বে উল্টে দেওয়া না যায়, তবে ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি সংকট নয় তারেক রহমান সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার কফিনে প্রথম বড় পেরেক হয়ে থাকবে।
Comments