ইতিহাসের গতিপথ: রৈখিক না চক্রাকার?
দর্শন, সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন বিতর্ক হলো ইতিহাসের গতিমুখ নিয়ে। মানব ইতিহাস কি সামনের দিকে রৈখিকভাবে এগিয়ে চলে যেমনটা ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তাঁর বিখ্যাত উক্তি "ইতিহাসের সমাপ্তি" মাধ্যমে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পক্ষে বলেছিলেন? নাকি ইতিহাস চক্রাকারে আবর্তিত হয় যেমনটা ইবনে খালদুন তাঁর প্রজন্মীয় উত্থান ও পতনের তত্ত্বে বলেছিলেনঃ "অতীত ভবিষ্যতের সাথে এতটাই মিলে যায় যেমন এক ফোঁটা জল আরেক ফোঁটা জলের মতো"?
ইতিহাসের সমাপ্তি বলতে মানবজাতির বিলুপ্তি বোঝায় না। বরং এটি এমন একটি অবস্থাকে বোঝায় যেখানে মানবজাতি একটি প্রভাবশালী মতাদর্শ ও কার্যপদ্ধতিতে এসে একমত হয়।
এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যকার টানাপোড়েন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অনেক চিন্তাবিদকে আকৃষ্ট করেছে এবং প্রত্যেকে নিজস্ব ভাষায় তা প্রকাশ করেছেন। মার্ক টোয়েনের নামে প্রচলিত একটি বিখ্যাত উক্তি বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরেঃ "ইতিহাস নিজেকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করে না, তবে ছন্দে মিলে যায়।" আর হেগেল, যাঁর কাঠামোও একটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ধাবিত হয়েছিল এবং যাঁর কাজ ফুকুয়ামাকে সরাসরি প্রভাবিত করেছিল, তিনি বলেছিলেন: "ইতিহাস হলো স্বাধীনতার চেতনার অগ্রগতি এবং এর পরিণতি হলো সেই বিন্দু যেখানে আত্মা সম্পূর্ণরূপে নিজেকে উপলব্ধি করে।"
ইতিহাস কি সামনে এগিয়ে চলছে, নাকি নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে?
প্রথম দৃষ্টিতে আধুনিক জীবন দেখলে উত্তরটি স্পষ্ট মনে হয়। প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলো বিকশিত হচ্ছে এবং সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। তবু যখন আমরা বৃহত্তর পরিসরে তাকাই, তখন মানব সংগঠনের উত্থান ও পতন, স্থিতিশীলতা ও ক্ষয়ের ধারাগুলো বারবার একই রকম দেখায়।
এ থেকে ইতিহাসের দুটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে:
১। ইতিহাসের রৈখিক দৃষ্টিভঙ্গিঃ ইতিহাস একটি নির্দিষ্ট দিকে এগিয়ে যায় (অগ্রগতি, মুক্তি, অথবা একটি চূড়ান্ত অবস্থার দিকে)
২। ইতিহাসের চক্রাকার দৃষ্টিভঙ্গিঃ ইতিহাস নির্দিষ্ট ধারায় পুনরাবৃত্তি করে (উত্থান, শীর্ষ, পতন, পুনর্জন্ম এবং আবার সেই চক্র)
কেবল একাডেমিক বিতর্কের বাইরেও এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এমনকি ব্যক্তিগত পরিবর্তনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করি তা গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
ইতিহাসের রৈখিক দৃষ্টিভঙ্গি: অগ্রগতি হিসেবে ইতিহাস
রৈখিক দৃষ্টিভঙ্গি মনে করে যে ইতিহাস একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে। এর একটি দিক-নির্দেশনা আছে এবং প্রায়শই একটি লক্ষ্যও আছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, মানবজাতি অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয় সেই শিক্ষা লিপিবদ্ধ করে এবং ধীরে ধীরে জীবন পরিচালনার উন্নততর পদ্ধতি তৈরি করে। ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সমাজ জ্ঞান সঞ্চয় করে এবং পুনরাবৃত্ত সমস্যা মোকাবেলায় নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। প্রযুক্তি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনও সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতি তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ শিকারি-সংগ্রাহক বা যাযাবর সমাজের কাঠামো কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। কৃষিভিত্তিক সমাজও আবার আধুনিক শিল্পভিত্তিক নগর সমাজ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানবজাতি নতুন নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে থাকে এবং সঞ্চিত জ্ঞান ব্যবহার করে সেগুলোর মোকাবেলা করে শেষ পর্যন্ত এমন ধারণা ও ব্যবস্থা তৈরি করে যা কোটি কোটি মানুষ গ্রহণ করে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক পুঁজিবাদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত আশাবাদের সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি ব্যাখ্যা করে কেন আমরা প্রায়ই ভবিষ্যৎকে অতীতের চেয়ে ভালো হবে বলে আশা করি। তবে এর একটি দুর্বলতা আছে। এটি ধারাবাহিকতা ও উন্নতিকে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেয় এবং প্রায়ই পতনের সম্ভাবনাকে অবমূল্যায়ন করে।
<img src ='https://cms.thepapyrus.com.bd/public/storage/inside-article-image/25y21ftm3.jpg'>
হেগেল এবং বিশ্বের আত্মা (Weltgeist)
এই ধারার সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তাবিদদের একজন হলেন ফ্রিডরিখ হেগেল। হেগেল ইতিহাসের বিকাশকে একটি যুক্তিসম্মত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছিলেন যা বিরোধী ধারণার সংঘর্ষ (থিসিস ও অ্যান্টিথিসিস) এবং সমন্বয়ের (সিনথেসিস) মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সমাজগুলো দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয় যা ধীরে ধীরে অতিক্রম করা যায় এবং উচ্চতর বোঝাপড়ার স্তর তৈরি হয়। অগ্রগতির এই ধারণাটি তাঁর বিখ্যাত উক্তিতে প্রতিফলিত হয়ঃ "মিনার্ভার পেঁচা কেবল সন্ধ্যার আঁধার নামলেই ডানা মেলে।" এর মাধ্যমে হেগেল বলতে চেয়েছিলেন যে মানুষ ইতিহাসকে পেছন থেকে বোঝে। একটি ঐতিহাসিক যুগ পরিপক্ব হয়ে যাওয়ার পরে। তাঁর দৃষ্টিতে, বিশ্বআত্মা (Geist) ক্রমশ নিজেকে বুঝতে পারে যখন ইতিহাস উন্মোচিত হয়। ইতিহাস এলোমেলো নয় বরং এটি আত্মা ও স্বাধীনতার ক্রমিক প্রকাশ।
প্রুশিয়ায় শিক্ষকতা করা হেগেল লিখেছিলেনঃ "জার্মান আত্মা হলো নতুন বিশ্বের আত্মা। এর লক্ষ্য হলো পরম সত্যের বাস্তবায়ন। স্বাধীনতার সীমাহীন আত্মনিয়ন্ত্রণ। এমন স্বাধীনতা যার নিজস্ব পরম রূপই তার উদ্দেশ্য।" হেগেলকে পড়া কঠিন, তবে অনেকে এই সিদ্ধান্তে আসেন যে তিনি জার্মানিক-খ্রিষ্টীয় বিশ্বকে, বিশেষত প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারের পরে, সেই মঞ্চ হিসেবে দেখেছিলেন যেখানে অন্তর্মুখী স্বাধীনতার ধারণা পূর্ণরূপে চেতনায় আসে। তিনি আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রকেও সেই রাজনৈতিক রূপ হিসেবে দেখেছিলেন যেখানে স্বাধীনতাকে যুক্তিসম্মতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়।
মার্ক্স এবং শ্রেণিসংগ্রামের পরিণতি
হেগেলের উপর ভিত্তি করে কার্ল মার্ক্স একটি বস্তুবাদী সংস্করণ উপস্থাপন করেন। মার্ক্সের মতে, ইতিহাস শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমে এগিয়ে যায়, সামন্তবাদ থেকে পুঁজিবাদে এবং অবশেষে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের দিকে। মার্ক্স ধারণা করেছিলেন যে পুঁজিবাদ ও শিল্পায়ন পরিপক্ব হওয়ার সাথে সাথে শ্রমিকদের শোষণ বাড়তে থাকবে, কিন্তু তারা ক্রমশ সংগঠিত হবে এবং শেষ পর্যন্ত পুঁজিপতি শ্রেণিকে উৎখাত করে সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে যা পরিণামে সাম্যবাদের দিকে নিয়ে যাবেঃ "পুঁজিবাদের এই বৈরিতাগুলো একটি বিপ্লবী সংকট তৈরি করবে। কিন্তু এর সাথে সাথে শ্রমিক শ্রেণির বিদ্রোহও বাড়বে, এমন এক শ্রেণি যা সংখ্যায় ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শৃঙ্খলাবদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হচ্ছে। সর্বহারাদের হারানোর কিছু নেই তাদের শৃঙ্খল ছাড়া। জয় করার আছে একটি পৃথিবী। সকল দেশের শ্রমিকরা, ঐক্যবদ্ধ হও।"
লক্ষ্য হেগেলের থেকে ভিন্ন, কিন্তু কাঠামো একই: ইতিহাসের একটি দিকনির্দেশনা ও উদ্দেশ্য আছে।
ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা এবং ইতিহাসের সমাপ্তি
ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা যুক্তি দিয়েছিলেন যে শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটনার শেষ নয় বরং মতাদর্শগত বিবর্তনের শেষ। তাঁর মতে, উদারনৈতিক গণতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যার বিপরীতে সর্বজনীন আবেদনযোগ্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই।
"আমরা হয়তো কেবল স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তিই নয় বরং ইতিহাসের নিজেরই সমাপ্তি প্রত্যক্ষ করছি।" (The End of History- ১৯৮৯)
চক্রাকার দৃষ্টিভঙ্গি: পুনরাবৃত্তি হিসেবে ইতিহাস
চক্রাকার দৃষ্টিভঙ্গির মূল ধারণা হলো ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়, তারপর ক্ষয় পায়। সমাজগুলো শৃঙ্খলা, সংহতি ও উচ্চাভিলাষের মাধ্যমে উঠে আসে কিন্তু সময়ের সাথে তারা আরামপ্রিয়, আত্মতুষ্ট ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পতন ব্যতিক্রম নয় বরং ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত নিয়ম। রোম, আব্বাসীয়, উসমানীয় বা এমনকি আধুনিক আর্থিক চক্রের দিকে তাকালে এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
<img src ='https://cms.thepapyrus.com.bd/public/storage/inside-article-image/prc3y47m5.jpg'>
খালদুন: প্রজন্মীয় চক্র তত্ত্ব
সাম্রাজ্য উদয় হয়, বিকশিত হয়, ক্ষয় পায় এবং পতন ঘটে আর নতুন সাম্রাজ্য আবির্ভূত হয়। ইবনে খালদুন মধ্যযুগে এই ধারাটি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে চিহ্নিত করেছিলেন। বিশেষত রাজবংশের পরিবর্তন বিশ্লেষণে। এই দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম প্রাচীন প্রকাশ পাওয়া যায় ইবনে খালদুনের লেখায়। তাঁর মুকাদ্দিমায় তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে শক্তিশালী, সংহত গোষ্ঠীগুলো আসাবিয়্যাহ বা সামাজিক সংহতির শক্তিতে ক্ষমতা দখল করে, রাষ্ট্র গড়ে, আরামপ্রিয় হয়, শৃঙ্খলা হারায় এবং পরিণামে নতুন গোষ্ঠী দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। এটি ক্ষমতা ও ক্ষয়ের একটি চক্র।
ভিকো: কোর্সি এ রিকোর্সি (উত্থান ও পতনের আবর্তন)
জিয়াম্বাত্তিস্তা ভিকো তাঁর ১৭২৫ সালের গ্রন্থ Scienza Nuova (নতুন বিজ্ঞান) এ যুক্তি দিয়েছিলেন যে সব জাতি তিনটি পুনরাবৃত্ত যুগের মধ্য দিয়ে যায়। তিনটি যুগ হলোঃ দেবতাদের যুগ, যেখানে মানুষ জগতকে ঐশ্বরিক কর্তৃত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে। বীরদের যুগ যেখানে অভিজাত শক্তি ও পুরাণ আধিপত্য করে এবং মানুষের যুগ, যেখানে যুক্তি ও গণতান্ত্রিক সাম্য প্রাধান্য পায়।
"জাতির স্বভাব প্রথমে অপরিশোধিত, তারপর কঠোর, তারপর বিনয়ী, তারপর সুকুমার, শেষে বিলাসী।" যুক্তি যখন শীর্ষে পৌঁছায়, সংহতি দুর্বল হয় এবং সংকট আসে। তাই তাঁর বিখ্যাত অন্তর্দৃষ্টিঃ "মানুষ প্রথমে প্রয়োজন অনুভব করে, তারপর উপযোগিতা খোঁজে, পরে আরামের প্রতি মনোযোগ দেয়, তারপর আনন্দে মগ্ন হয়, বিলাসী হয়ে পড়ে এবং শেষে পাগলামিতে নিজের সম্পদ নষ্ট করে।"
বিংশ শতাব্দীতে অসওয়াল্ড স্পেংলার আরও হতাশাবাদী অবস্থান নিয়েছিলেন। The Decline of the West গ্রন্থে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে সভ্যতাগুলো জীবন্ত প্রাণীর মতো। এগুলো জন্মায়, পরিণত হয় এবং অনিবার্যভাবে মৃত্যুবরণ করে। অগ্রগতি সার্বজনীন নয়। এটি সভ্যতাবিশেষ এবং সাময়িক। আরেকজন প্রধান ব্যক্তিত্ব আর্নল্ড জে. টয়নবি একাধিক সভ্যতা অধ্যয়ন করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে সভ্যতাগুলো চ্যালেঞ্জের প্রতিক্রিয়ায় উদয় হয়, কিন্তু মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হলে পতন ঘটে। আবারও, ধারাটি রৈখিক অগ্রগতির নয় বরং বারবার উত্থান ও পতনের।
দুটি দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষ
এই দুটি কাঠামোর মধ্যে উত্তেজনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তারা একই ঘটনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। নিচের সারণিটি দেখায় কীভাবে প্রতিটি উন্নয়নকে দুটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়:
সংক্ষেপে, রৈখিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবণতার উপর জোর দেয়, আর চক্রাকার দৃষ্টিভঙ্গি ধারার উপর।
তারা কি সত্যিই বিপরীত?
সবচেয়ে আকর্ষণীয় অন্তর্দৃষ্টি হলো এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গি পরস্পর বিরোধী নাও হতে পারে। মনোযোগ দিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে অনেক ক্ষেত্রে এই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ইতিহাসকে ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ করে। ইতিহাস একটি স্তরে রৈখিক এবং অন্য স্তরে চক্রাকার হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রযুক্তি ও জ্ঞান হয়তো রৈখিকভাবে এগিয়ে যায়, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামাজিক আচরণ — বিশেষত বৈষম্য ও সংহতি — চক্রাকারে আবর্তিত হতে পারে।
এটি একটি স্তরযুক্ত বাস্তবতা তৈরি করে। আমাদের কাছে রোমানদের চেয়ে উন্নত প্রযুক্তি আছে কিন্তু আমরা তবুও তাদের রাজনৈতিক ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি করতে পারি। এমনকি একটি একক সমাজের মধ্যেও উভয় ধারা পরিলক্ষিত হয়ঃ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি রৈখিক মনে হতে পারে আর স্বল্পমেয়াদি ব্যবসায়িক চক্র উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে যায়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উদারতাবাদ ও কর্তৃত্ববাদও চক্রাকারে উত্থান-পতনের মধ্যে থাকে।
ইতিহাসের সর্পিল দৃষ্টিভঙ্গি বলে যে ইতিহাস অবিরাম অগ্রগতির সরলরেখায় চলে না, আবার হুবহু পুনরাবৃত্তির বদ্ধ বৃত্তেও নয়। বরং এটি একটি সর্পিল, তরঙ্গাকার ধারায় উন্মোচিত হয়, যেখানে মানবজাতি পরিচিত সংকট, প্রবণতা ও কাঠামোগত পর্যায়গুলোতে বারবার ফিরে আসেঃ যেমন যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত বিপর্যয়, সামাজিক অবক্ষয় বা পুনর্জাগরণ । কিন্তু প্রতিবার ভিন্ন মাত্রার উন্নয়ন, জটিলতা ও সক্ষমতায়। এই মিশ্র দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন আধুনিক সমাজ একই সাথে উন্নত ও ভঙ্গুর মনে হতে পারে।
শেষ কথা: এই বিতর্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আমরা ইতিহাসকে যেভাবে দেখি তা আমাদের নতুন পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়ার ধরন নির্ধারণ করে। রৈখিক দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতে বিনিয়োগ, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং উন্নতি সম্ভব এই বিশ্বাসকে উৎসাহিত করে। চক্রাকার দৃষ্টিভঙ্গি, বিপরীতভাবে স্থিতিস্থাপকতা, সতর্কতা এবং স্থায়িত্বের প্রতি সংশয়কে গুরুত্ব দেয়।
বাস্তব অর্থে, রৈখিক চিন্তা উদ্ভাবন ও উচ্চাভিলাষকে চালিত করে, আর চক্রাকার চিন্তা বিচক্ষণতা ও সতর্কতাকে উৎসাহিত করে। যে সমাজ রৈখিকতাকে উপেক্ষা করে সে স্থবিরতার ঝুঁকিতে পড়ে, আর যে সমাজ চক্রকে উপেক্ষা করে সে পতনের ঝুঁকিতে পড়ে। সবচেয়ে স্থিতিশীল পথ নিহিত আছে উভয় দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায়।
এই দ্বৈত স্বভাব বোঝা আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, একই সাথে এই সত্যকে ভুলতে না দিয়ে যে পতন সর্বদাই একটি সম্ভাবনা।
Comments