ভারতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয় লাভের ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের সংশ্লিষ্টতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত দিক। বিশেষত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তার কন্যা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের বহু নেতা জীবন বাঁচাতে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। শেখ হাসিনা তার স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে ১৯৭৫—১৯৮১ সাল পর্যন্ত ৬ বছর ভারতে অবস্থান করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে বাঙালি কংগ্রেস নেতা ভারতের পরলোকগত প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির তত্ত্বাবধানে দিল্লিতে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয় যদিও নিরাপত্তার স্বার্থে ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছিল। একই সময় মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীও পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকাল আশ্রয় নিয়েছিলেন।
পরবর্তীকালে ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা পুনরায় ভারতে আশ্রয় নেন। এই সময়ও আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যক নেতা—কর্মী জীবন বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নেন। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের আধিপত্যবাদ বা হস্তক্ষেপের বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে। বাংলাদেশের সরকারপ্রধান এবং একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের বারবার ভারতে আশ্রয় গ্রহণ এবং সেখান থেকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ প্রমাণ করে যে, প্রতিবেশি দেশের উপর ভারতের একটি বিশেষ প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে যখনই আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে, ভারত তখন তাদের আশ্রয় দিয়ে সহযোগিতা করেছে, যা ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশে তাদের পছন্দের রাজনৈতিক ধারাকে টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে বিবেচিত।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং অনেকে এই আশ্রয়কে একটি মানবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সমর্থনের ধারাবাহিকতা মাত্র। তাদের মতে, এভাবে আশ্রয়দান ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ফল। তবে ভারতের মাটিতে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায় যা ভারতীয় আধিপত্যবাদ সংক্রান্ত আলোচনায় একটি শক্তিশালী যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই ঘটনা বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের পরিবর্তে ভারতের উপর নির্ভরশীল বা ভারত প্রভাবিত রাষ্ট্র হিসেবে দেখার ধারণাকে শক্তিশালী করে তোলে।
পছন্দের দলকে ক্ষমতায় আনতে প্রভাব খাটানো
ভারত বাংলাদেশে এমন সরকার বা রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায় যারা ভারতের আঞ্চলিক ভূ—রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে। এই লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন বা রাজনৈতিক সংকটের সময় ভারত তাদের অনুকূল শক্তিকে সমর্থন জুগিয়ে থাকে। চার দিনের ভারত সফর শেষে ঢাকায় ফিরে জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেছেন, ‘বাংলাদেশে সময়মতো একটি সুন্দর নির্বাচন চায় ভারত; এবং তারা চায়, নির্বাচনের আগে এবং পরে বাংলাদেশে যাতে কোনো ক্রমেই সহিংসতা, অরাজকতা না হয়।’
২০২৩ সালের ২৩ আগস্ট ভারত সফর শেষে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে ভারতের চাওয়া সম্পর্কে বলেন, ‘ওনারা একটা ভালো নির্বাচন দেখতে চান বাংলাদেশে এবং সময়মতো যাতে হয়। নির্বাচনের আগে এবং পরে যাতে কোনো সহিংসতা বা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় অনিশ্চিত কিছু না হয়। এটা হলে ওনারা খুশি হবেন। কারণ এখানে ওনাদের অনেক ধরনের বিনিয়োগ আছে। ভারতের প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করে জিএম কাদের বলেন, ‘বাংলাদেশ যদি স্থিতিশীল থাকে এবং সার্বিকভাবে সুন্দর একটা নির্বাচনের মাধ্যমে যদি পরবর্তী সরকার গঠিত হয় তাহলে তাদের পক্ষে কাজকর্ম করা সহজ হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভারতে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে তার খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কার কার সঙ্গে আলাপ—আলোচনা হয়েছে এবং কী বিষয়ে হয়েছে সে সম্পর্কে তিনি ভারতের অনুমিত ছাড়া কথা বললে অস্বীকৃতি জানান।
আওয়ামী লীগের পক্ষে ভারতের প্রভাব খাটানোর চেষ্টা
বাংলাদেশের অন্যতম কার্যক্রম নিষিদ্ধ প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে বিজয়ী করতে এবং ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারত প্রভাব খাটিয়েছে। এমন অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের আলোচনায় একটি মুখ্য ইস্যু। বিরোধী রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন সময় এই অভিযোগ উত্থাপন করেছে। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্য ভারত পরোক্ষভাবে প্রভাব খাটিয়েছিল। বিনিময়ে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা প্রদান, চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়া এবং বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দমন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বৈধতা দিতে ভারত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পশ্চিমা দেশগুলো যখন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল তখন ভারত দ্রুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে এবং তাদের টিকিয়ে রাখতে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলো নিয়ে ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠলে আন্তর্জাতিক মহল থেকে হাসিনা সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি হয়। ভারত এই সময় আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে প্রকাশ্যে ও গোপনে কূটনৈতিক তৎপরতা চালায় এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে হাসিনা সরকারকে সমর্থন জোগায়। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে যে, তারা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় কূটনীতিকদের আচরণ এবং মন্তব্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তারা প্রকাশ্যে বা গোপনে এমন সব বিবৃতি বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন যা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। ভারত বরাবরই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ভারতের দাবি, তারা সব সময় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্মান করে এবং দুদেশের সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং উত্তর—পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভারত বাংলাদেশে একটি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সরকার দেখতে চায়। আওয়ামী লীগ সরকার ভারতকে তার নিরাপত্তা ও কানেক্টিভিটির বিষয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেয়ায় ভারত পরিত্যক্ত আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখে। এই সমর্থন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতীয় আধিপত্যবাদের একটি অন্যতম বহিঃপ্রকাশ বলে বিবেচিত হয়। পছন্দের সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা এবং ক্ষমতাসীন দলের উপর বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারত সরকার চাপ দেয়। যেমন: কোনো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করা। ভারত কৌশলগত ইস্যুতে চাপ প্রয়োগ করে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সীমিত করেছে। এই দ্বৈত নীতি বা ''Sticks and Carrots' কৌশলটি বিভিন্ন উপায়ে ভারত বাস্তবায়ন করে থাকে।
আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিতে ভারতের ভূমিকা
বাংলাদেশের সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে আন্তর্জাতিক চাপ থেকে রক্ষা করতে এবং কৌশলগত সুবিধা বজায় রাখতে ভারত কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। এই প্রভাবকে ভারতীয় আধিপত্যবাদের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখা হয় যেখানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের কৌশলগত স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনকে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত, আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশ নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার পথ হারিয়ে ফেলে। ২০১৪ সালে জানুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের পর থেকে গণতন্ত্রকে অন্ধকার যুগে নিক্ষেপ করা হয়। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল গণতন্ত্রকে পদদলিত করার ধারাবাহিকতা মাত্র। ২০১৪ সালের পর থেকে তিনটি সাধারণ নির্বাচন খাতা কলমে বৈধ ছিল। কিন্তু এসব নির্বাচনে কোনোভাবেই গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণা, মূল্যবোধ এবং মান লালন করা হয়নি। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে দৃশ্যত বিপুল বিজয়ের পর টানা চতুর্থ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করার পর মনে হয়েছিল, শেখ হাসিনা এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেছেন।
পতিত সরকারকে রক্ষা করার কৌশল
নির্বাচনকালীন অনিয়ম, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা গণতন্ত্রের ঘাটতির কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হলে ভারত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। ভারত পর্দার আড়াল থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক মধ্যস্থতা করে আওয়ামী লীগ সরকারের উপর চাপ কমাতে ভূমিকা রেখেছে। ভারতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরাসরি পশ্চিমা নেতাদের কাছে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এই সমর্থনের প্রধান ভিত্তি হলো অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার যুক্তি। ভারত প্রায়ই যুক্তি দেখায় যে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং তাদের উত্তর—পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। এই যুক্তিতে তারা পশ্চিমা দেশগুলোকে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করতে উৎসাহিত করেছে যদিও এতে গণতন্ত্রের মানদণ্ড উপেক্ষিত হয়েছে। এছাড়া, ভারত সরকার আওয়ামী লীগকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য মনে করে। ভারত—বিরোধী জঙ্গি ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো (যেমন—উলফা) দমনে আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগিতা এই নিরাপত্তা স্বার্থই আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের অবিচল সমর্থনের প্রধান কারণ বলে বিবেচিত হয়।
ভারত শুধু আওয়ামী লীগ সরকারকে রক্ষা করেছে তাই নয়, বরং কৌশলগত সুবিধা আদায়ের জন্য চাপ প্রয়োগের 'Sticks and Carrots' (দণ্ড ও প্রলোভন) নীতিও অনুসরণ করেছে। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা বজায় রাখতে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে সীমিত করে। একইভাবে ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি সুবিধার মতো কৌশলগত বিষয়গুলোতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ভারত কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে যাতে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধার মাধ্যমে ভারতের কৌশলগত স্বার্থ পূরণ হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর ভারত সরকারের অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের পলাতক নেতারা বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত থাকায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশে নির্বাচন বাঞ্ছালের তৎপরতা বন্ধে ভারতের সহায়তা চেয়েছিল।
পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ ও প্রয়োগে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের ব্যাপক প্রভাব যা অনেক সময় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ভারতের আঞ্চলিক কৌশলগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে বাধ্য করে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত—বিরোধী হিসেবে পরিচিত অন্য কোনো দেশের (যেমন— চীন বা পাকিস্তানের) সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উপর দিল্লি থেকে কূটনৈতিক চাপ আসে। এই প্রভাব ভারতীয় আধিপত্যবাদের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারত তার উত্তর—পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নীতিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তার মাধ্যমে ভারত সরকার বাংলাদেশে অবস্থানকারী ভারতবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে কঠোরভাবে দমনের জন্য চাপ দেয়। এই সহযোগিতার মাধ্যমে ভারতের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশকে দুর্বল অবস্থানে রাখে বিশেষত সীমান্ত হত্যা বা অন্যান্য ঘটনায় শক্ত কূটনৈতিক অবস্থান নিতে বাধা সৃষ্টি করে।
অর্থনৈতিক ও কানেক্টিভিটি সুবিধার ক্ষেত্রে ভারত তার পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের জন্য ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা আদায় করেছে। বিনিময়ে বাংলাদেশ ন্যায্য ফি আদায়ে দুর্বলতা দেখিয়েছে। এছাড়া, দুটি দেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের অনুকূলে থাকলেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এই ভারসাম্যহীনতা কমাতে তেমন কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায়ই ভারতের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। বিশেষ করে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করতে ভারত চায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি চীনের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলুক যা বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে হস্তক্ষেপের শামিল। ভারতের চাপের কারণে বাংলাদেশ তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে বাধাগ্রস্ত হয়। এতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের স্বার্থের প্রতিফলন ঘটে। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা এই আধিপত্যবাদের সবচেয়ে বড় প্রমাণগুলোর অন্যতম। এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে ভারতকে কার্যকরভাবে চাপ দিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারতের ‘বড় ভাইসুলভ’ মনোভাবের কাছে নতিস্বীকার করে যেখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থই অগ্রাধিকার পায়।
Comments